আয়কর রিটার্ন জমায় ছোট ভুলে বড় ঝামেলা, যে ১০টি বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি
প্রতি বছর আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় অনেক করদাতা তাড়াহুড়ো করে প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ করেন। কেউ আয়ের একটি অংশ উল্লেখ করতে ভুলে যান, কেউ সম্পদের হিসাব দেন অসম্পূর্ণভাবে, আবার কেউ আগের বছরের তথ্য যাচাই না করেই নতুন রিটার্ন জমা দেন। এসব ভুলকে অনেকে সাধারণ বিষয় মনে করলেও পরবর্তী সময়ে তা কর নির্ধারণ, অতিরিক্ত কর, জরিমানা কিংবা কর কর্তৃপক্ষের জিজ্ঞাসাবাদের কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশে আয়কর রিটার্ন এখন অনেকটাই অনলাইননির্ভর। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ই-রিটার্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে ঘরে বসেই রিটার্ন জমা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে অনলাইনে ফরম পূরণ সহজ হলেও সঠিক তথ্য দেওয়া করদাতার নিজের দায়িত্ব। বিশেষ করে আয়, ব্যয়, সম্পদ, দায়, বিনিয়োগ এবং উৎসে কর্তিত করের তথ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা জরুরি।
আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী রিটার্নে শুধু আয় নয়, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সম্পদ, দায় এবং জীবনযাত্রাসংশ্লিষ্ট ব্যয়ের তথ্যও দিতে হয়। ফলে একটি ছোট ভুলও পরবর্তী সময়ে বড় জটিলতা তৈরি করতে পারে।
২০২৬-২৭ করবর্ষে রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় কোন ১০টি বিষয়ে বিশেষ সতর্ক থাকা প্রয়োজন, তা জেনে নেওয়া যাক।
২০২৬-২৭ করবর্ষে আয়কর রিটার্ন জমার আগে যে ১০টি বিষয়ে সতর্ক থাকবেন
১. আয়ের সব উৎস সঠিকভাবে উল্লেখ না করা
আয়কর রিটার্নে সবচেয়ে সাধারণ ভুলগুলোর একটি হলো আয়ের সব উৎস উল্লেখ না করা। অনেক করদাতা শুধু চাকরির বেতন বা ব্যবসার আয় দেখান। কিন্তু বাস্তবে একজন ব্যক্তির একাধিক উৎস থেকে আয় থাকতে পারে।
যেমন, চাকরির বেতনের পাশাপাশি বাড়িভাড়া, ব্যাংক আমানতের সুদ, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা, শেয়ারবাজার থেকে আয়, পরামর্শক হিসেবে উপার্জন কিংবা অন্য কোনো বৈধ উৎস থেকে অর্থ আসতে পারে।
এসব আয় প্রযোজ্য করবিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট খাতে উল্লেখ করা জরুরি।
বিশেষ করে একই আয়বর্ষে একাধিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি পরিবর্তন করলে সব প্রতিষ্ঠানের বেতন ও অন্যান্য প্রাপ্য হিসাব করতে হবে। শুধু সর্বশেষ প্রতিষ্ঠানের বেতন দেখালে মোট আয় কম দেখানো হতে পারে।
যা করবেন:
-
সব প্রতিষ্ঠানের বেতন সনদ সংগ্রহ করুন।
-
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সুদের বিবরণী যাচাই করুন।
-
বাড়িভাড়া ও অন্যান্য উৎসের আয় হিসাব করুন।
-
ব্যবসা বা পেশাগত আয়ের ক্ষেত্রে আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ করুন।
আয়ের কোনো উৎস বাদ পড়েছে কি না, রিটার্ন জমার আগে তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
২. সম্পদ ও দায়ের তথ্য অসম্পূর্ণ রাখা
অনেক করদাতা মনে করেন, শুধু আয় ও করের হিসাব দিলেই রিটার্ন সম্পূর্ণ হয়। কিন্তু আয়কর রিটার্নে সম্পদ ও দায়ের বিবরণও গুরুত্বপূর্ণ।
আয়কর আইন, ২০২৩ এবং সংশ্লিষ্ট সংশোধিত বিধান অনুযায়ী প্রযোজ্য করদাতাদের সম্পদ ও দায়ের বিবরণ দিতে হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশি আবাসিক ব্যক্তি করদাতাদের ক্ষেত্রে দেশ-বিদেশে থাকা সম্পদ ও দায়ের তথ্য দেওয়ার বিধান রয়েছে।
সম্পদের মধ্যে থাকতে পারে:
-
ব্যাংকে জমা অর্থ ও নগদ টাকা।
-
জমি, ফ্ল্যাট ও অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তি।
-
গাড়ি ও অন্যান্য মূল্যবান যানবাহন।
-
সঞ্চয়পত্র, এফডিআর ও ডিপিএস।
-
শেয়ার, বন্ড ও অন্যান্য আর্থিক বিনিয়োগ।
-
স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য মূল্যবান সম্পদ।
অন্যদিকে ব্যাংকঋণ, ব্যক্তিগত ঋণ এবং অন্যান্য আর্থিক দায়ও প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী উল্লেখ করতে হবে।
ধরুন, কোনো করদাতার নামে একটি ফ্ল্যাট রয়েছে, কিন্তু তিনি সম্পদের বিবরণে সেটি উল্লেখ করেননি। পরবর্তী সময়ে কর কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি ধরা পড়লে ফ্ল্যাট কেনার অর্থের উৎস সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে হতে পারে।
তাই সম্পদ গোপন না করে প্রকৃত তথ্য ও প্রয়োজনীয় দলিল সংরক্ষণ করা জরুরি।
৩. আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে অসংগতি রাখা
রিটার্নে প্রদর্শিত আয় এবং ব্যক্তিগত ব্যয়ের মধ্যে যৌক্তিক সামঞ্জস্য থাকা প্রয়োজন।
ধরুন, একজন ব্যক্তি বছরে পাঁচ লাখ টাকা আয় দেখিয়েছেন। কিন্তু একই সময়ে তাঁর পারিবারিক ব্যয়, বাড়িভাড়া, সন্তানদের শিক্ষার খরচ, চিকিৎসা, ভ্রমণ ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে আট লাখ টাকা।
এক্ষেত্রে অতিরিক্ত তিন লাখ টাকার উৎস কী, সেই প্রশ্ন উঠতে পারে।
অবশ্যই পরিবারের অন্য সদস্যের আয়, পূর্ববর্তী সঞ্চয়, বৈধ উপহার বা ঋণের মতো অর্থের উৎস থাকতে পারে। কিন্তু এসব অর্থের উৎস যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করতে না পারলে অসংগতি তৈরি হতে পারে।
যা করবেন: নিজের বার্ষিক আয়, ব্যক্তিগত ব্যয়, পারিবারিক ব্যয় এবং অন্যান্য অর্থের উৎসের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখুন। প্রয়োজনে ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ঋণের কাগজপত্র ও অর্থপ্রাপ্তির প্রমাণ সংরক্ষণ করুন।
৪. ব্যাংক হিসাব, এফডিআর ও সঞ্চয়পত্রের তথ্য বাদ দেওয়া
অনেক করদাতা ব্যাংক হিসাবের ব্যালান্স জানলেও এফডিআর, ডিপিএস, সঞ্চয়পত্র কিংবা অন্যান্য বিনিয়োগের তথ্য দিতে ভুল করেন।
এসব আর্থিক সম্পদ প্রযোজ্য ক্ষেত্রে রিটার্নের সম্পদ বিবরণীতে দেখাতে হয়। পাশাপাশি এগুলো থেকে অর্জিত সুদ বা মুনাফার তথ্যও সংশ্লিষ্ট আয় খাতে সঠিকভাবে উল্লেখ করা জরুরি।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তির ব্যাংকে পাঁচ লাখ টাকা এবং সঞ্চয়পত্রে দশ লাখ টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। তিনি যদি শুধু ব্যাংকের অর্থ দেখান এবং সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ বাদ দেন, তাহলে সম্পদের বিবরণ অসম্পূর্ণ হতে পারে।
এ ছাড়া ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে উৎসে কর কাটা হলে তার প্রমাণও সংগ্রহ করতে হবে।
যা করবেন:
-
ব্যাংক স্টেটমেন্ট সংগ্রহ করুন।
-
এফডিআর ও ডিপিএসের বিবরণী যাচাই করুন।
-
সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ ও মুনাফার তথ্য মিলিয়ে নিন।
-
উৎসে কর কর্তনের সনদ সংরক্ষণ করুন।
৫. নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকারের মূল্য ভুল দেখানো
নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকারের বিবরণ দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনেক সময় অসংগতি দেখা যায়।
কেউ প্রকৃত নগদ অর্থের তুলনায় অনেক বেশি টাকা দেখান, আবার কেউ সম্পদের বিবরণে থাকা স্বর্ণালংকারের পরিমাণ বা মূল্য সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারেন না।
এ ধরনের অসংগতির কারণে সম্পদের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন উঠতে পারে।
বিশেষ করে স্বর্ণালংকারের ক্ষেত্রে কেনার সময়, পরিমাণ, আনুমানিক মূল্য এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে প্রাসঙ্গিক তথ্য সংরক্ষণ করা ভালো।
একইভাবে নগদ অর্থের পরিমাণ নির্ধারণের সময় ব্যাংক থেকে উত্তোলন, ব্যবসায়িক লেনদেন, সঞ্চয় কিংবা অন্যান্য বৈধ অর্থপ্রাপ্তির সঙ্গে হিসাব মিলিয়ে দেখা উচিত।
মনে রাখতে হবে, সম্পদের পরিমাণ বাড়িয়ে বা কমিয়ে দেখানো কোনোভাবেই নিরাপদ পদ্ধতি নয়। প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতে হিসাব প্রস্তুত করাই সঠিক।
৬. জমি, ফ্ল্যাট ও গাড়ির তথ্য সঠিকভাবে না দেওয়া
জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ি ও গাড়ির মতো বড় সম্পদের তথ্য আয়কর রিটার্নে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
অনেক সময় করদাতারা জমি বা ফ্ল্যাটের ক্রয়মূল্য, মালিকানার অংশ, কেনার সময় কিংবা অবস্থানের তথ্য ভুলভাবে উল্লেখ করেন। আবার কেউ পুরোনো সম্পদ নতুন করে কেনা হয়েছে এমনভাবে দেখান, যা সম্পদের ধারাবাহিক হিসাবের সঙ্গে অসংগতি তৈরি করতে পারে।
সম্পত্তির ক্ষেত্রে কেনার দলিল, নিবন্ধনসংক্রান্ত কাগজপত্র, মূল্য পরিশোধের প্রমাণ এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য নথি সংরক্ষণ করা উচিত।
গাড়ির ক্ষেত্রেও ক্রয়মূল্য, মালিকানা এবং প্রযোজ্য অন্যান্য তথ্য সঠিকভাবে উল্লেখ করতে হবে।
বিশেষ সতর্কতা: কোনো সম্পদ বিক্রি করলে বা নতুন সম্পদ কিনলে আগের বছরের সম্পদের হিসাবের সঙ্গে নতুন বছরের তথ্য মিলিয়ে দেখুন। সম্পদ বৃদ্ধির পেছনে অর্থের উৎসও ব্যাখ্যা করার মতো প্রমাণ রাখুন।
৭. ঋণ নেওয়া বা অন্যকে ঋণ দেওয়ার তথ্য গোপন করা
ব্যক্তিগত ঋণ, ব্যাংকঋণ কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তির কাছ থেকে নেওয়া অর্থ অনেক সময় রিটার্নে সঠিকভাবে উল্লেখ করা হয় না।
আবার কেউ অন্য ব্যক্তিকে বড় অঙ্কের টাকা ঋণ দিলেও সেটি সম্পদের বিবরণে দেখাতে ভুল করেন।
এ ধরনের তথ্য বাদ পড়লে সম্পদ ও দায়ের হিসাবের মধ্যে অসংগতি দেখা দিতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, একজন ব্যক্তি ব্যাংক থেকে ১০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে একটি গাড়ি কিনেছেন। তাঁর রিটার্নে গাড়ির মূল্য সম্পদ হিসেবে দেখানো হলেও ঋণের তথ্য বাদ পড়লে আর্থিক অবস্থার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না।
তাই ঋণের ক্ষেত্রে ঋণদাতার পরিচয়, ঋণের পরিমাণ, গ্রহণের সময়, পরিশোধের শর্ত এবং ব্যাংক লেনদেনের প্রমাণ সংরক্ষণ করুন।
ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে বড় অঙ্কের ঋণ বা অর্থপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট করবিধি আরও সতর্কভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
৮. উৎসে কর ও অগ্রিম করের তথ্য ভুল দেওয়া
অনেক করদাতার আয় থেকে বছরজুড়ে বিভিন্ন সময়ে উৎসে কর (Tax Deducted at Source বা TDS) কেটে রাখা হয়। আবার কেউ অগ্রিম করও পরিশোধ করেন।
কিন্তু রিটার্ন জমার সময় এসব অর্থের হিসাব ভুল দেওয়া হলে প্রকৃত করদায় নির্ধারণে সমস্যা হতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, একজন চাকরিজীবীর বেতন থেকে নিয়মিত কর কাটা হয়েছে। তিনি যদি রিটার্নে সেই করের পরিমাণ উল্লেখ না করেন, তাহলে তাঁর প্রদেয় করের হিসাব সঠিকভাবে প্রতিফলিত নাও হতে পারে।
একইভাবে ব্যাংকের সুদ, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা বা অন্যান্য উৎস থেকে কর্তিত করের তথ্যও যাচাই করা জরুরি।
যা করবেন:
-
নিয়োগকর্তার কাছ থেকে TDS সনদ সংগ্রহ করুন।
-
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর কর্তনের তথ্য নিন।
-
অগ্রিম করের চালান সংরক্ষণ করুন।
-
রিটার্নে উল্লেখ করা করের সঙ্গে প্রকৃত পরিশোধিত করের পরিমাণ মিলিয়ে নিন।
এতে একই করের ওপর পুনরায় কর হিসাব হওয়ার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা এড়ানো সহজ হবে।
৯. কর রেয়াত পাওয়ার জন্য ভুল বিনিয়োগের তথ্য দেওয়া
আয়কর রিটার্নে নির্দিষ্ট কিছু বিনিয়োগের বিপরীতে কর রেয়াত পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সব ধরনের বিনিয়োগ কর রেয়াতযোগ্য নয় এবং প্রতিটি বিনিয়োগের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম ও সীমা রয়েছে।
জীবনবিমা, নির্দিষ্ট সঞ্চয়পত্র, অনুমোদিত ভবিষ্য তহবিল, ডিপিএসসহ বিভিন্ন যোগ্য বিনিয়োগের তথ্য প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী উল্লেখ করা যেতে পারে।
কিন্তু অনেক সময় করদাতারা বিনিয়োগের পরিমাণ বেশি দেখান, যোগ্য নয় এমন বিনিয়োগের বিপরীতে রেয়াত দাবি করেন কিংবা প্রয়োজনীয় প্রমাণ সংরক্ষণ করেন না।
এতে কর হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে এবং অতিরিক্ত কর পরিশোধের পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
যা করবেন: বিনিয়োগের রসিদ, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, বিমার প্রিমিয়াম সনদ এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র যাচাই করে রেয়াত দাবি করুন।
শুধু কর কমানোর উদ্দেশ্যে ভুল বা অতিরঞ্জিত বিনিয়োগের তথ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
১০. যাচাই না করে রিটার্ন সাবমিট করা এবং সময়সীমা উপেক্ষা করা
অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া সহজ হলেও চূড়ান্ত সাবমিট করার আগে সব তথ্য যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক করদাতা তাড়াহুড়ো করে ই-রিটার্নের সব ঘর পূরণ করেন এবং সম্পূর্ণ রিটার্ন না দেখেই সাবমিট করে দেন। এতে বানান, টাকার অঙ্ক, আয়ের খাত, সম্পদের মূল্য কিংবা কর পরিশোধের তথ্যে ভুল থেকে যেতে পারে।
এ ছাড়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা না দিলে প্রযোজ্য অতিরিক্ত কর বা আর্থিক জরিমানার মুখে পড়তে হতে পারে।
২০২৬-২৭ করবর্ষে এনবিআরের ঘোষিত ব্যবস্থায় ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে প্রদেয় করের ওপর ৫ শতাংশ প্রণোদনার সুযোগ রাখা হয়েছে, যার সর্বোচ্চ সীমা ২৫ হাজার টাকা। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে জমা দিলে এই প্রণোদনা পাওয়া যায় না। ডিসেম্বরের পর বিলম্বে জমার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত করের বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।
তাই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা না করে আগেই রিটার্ন প্রস্তুত করা ভালো।
চূড়ান্ত সাবমিটের আগে যাচাই করুন:
-
সব আয়ের তথ্য দেওয়া হয়েছে কি না।
-
সম্পদ ও দায়ের হিসাব সঠিক কি না।
-
বার্ষিক ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না।
-
TDS ও অগ্রিম করের তথ্য সঠিক কি না।
-
কর রেয়াতের দাবি যথাযথ কি না।
-
প্রয়োজনীয় সব তথ্য ও হিসাব মিলেছে কি না।
রিটার্ন জমা দেওয়ার পর ভুল ধরা পড়লে কী করবেন?
অনেকের ধারণা, একবার অনলাইনে রিটার্ন সাবমিট হয়ে গেলে আর কোনো তথ্য সংশোধন করা সম্ভব নয়। তবে বিষয়টি পুরোপুরি সঠিক নয়।
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৮০ অনুযায়ী, নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে দাখিল করা রিটার্নে ভুল থাকলে সংশোধিত রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সাধারণভাবে মূল রিটার্ন জমার তারিখ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে সংশোধিত রিটার্ন জমা দিতে হয়। তবে এ সুযোগ মাত্র একবার এবং মূল রিটার্ন অডিটের জন্য নির্বাচিত হওয়ার পর সংশোধিত রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ থাকে না।
তাই ভুল ধরা পড়লে দেরি না করে সংশ্লিষ্ট বিধান অনুসরণ করে সংশোধনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
এ ক্ষেত্রে ভুলের ধরন, কর হিসাবের ওপর তার প্রভাব এবং সংশোধনের পদ্ধতি বুঝতে প্রয়োজনে কর আইনজীবী বা অভিজ্ঞ আয়কর পরামর্শকের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমার ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো জানা জরুরি
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ই-রিটার্ন ব্যবস্থা ব্যবহার করে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতারা অনলাইনে রিটার্ন জমা দিতে পারেন। ২০২৬-২৭ করবর্ষে অধিকাংশ নিয়মিত ব্যক্তি করদাতার জন্য অনলাইনে রিটার্ন জমা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণির করদাতা এবং অনুমোদিত ব্যতিক্রমের ক্ষেত্রে কাগজে রিটার্ন জমার সুযোগ রয়েছে।
ই-রিটার্ন জমার আগে সাধারণত নিচের কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা ভালো:
১ . ই-টিআইএন সনদ।
২ . আগের বছরের আয়কর রিটার্ন ও প্রাপ্তিস্বীকারপত্র।
৩ . বেতন সনদ বা ব্যবসায়িক আয়ের হিসাব।
৪ . ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও সুদের বিবরণী।
৫ . এফডিআর, ডিপিএস ও সঞ্চয়পত্রের তথ্য।
৬ . বিনিয়োগ ও কর রেয়াতের প্রমাণপত্র।
৭ . জমি, ফ্ল্যাট ও গাড়ির মালিকানার কাগজপত্র।
৮ . ঋণ ও অন্যান্য দায়ের বিবরণী।
৯ . উৎসে কর কর্তনের সনদ এবং অগ্রিম করের চালান।
এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী, অনলাইন রিটার্ন জমার সময় সাধারণত সহায়ক কাগজপত্র আপলোড করতে হয় না। তবে তথ্য পূরণের সময় প্রয়োজনীয় নথি সামনে রাখা এবং ভবিষ্যৎ যাচাইয়ের জন্য সেগুলো সংরক্ষণ করা জরুরি।
ই-রিটার্ন জমা দেওয়ার পর প্রাপ্তিস্বীকারপত্র (Acknowledgement Slip), রিটার্নের কপি এবং ট্যাক্স সার্টিফিকেট ডাউনলোড করে সংরক্ষণ করতে হবে।
অনলাইন রিটার্নসংক্রান্ত সহায়তার জন্য এনবিআরের হটলাইন নম্বর ০৯৬৪৩৭১৭১৭১-এ যোগাযোগ করা যায়। সরকারি ই-রিটার্ন পোর্টাল: https://etaxnbr.gov.bd/
‘জিরো রিটার্ন’ নিয়ে সতর্ক থাকুন
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় প্রচার করা হয়, আয়কর রিটার্নের সব ঘরে শূন্য লিখে রিটার্ন জমা দিলেই দায়িত্ব শেষ। কিন্তু এনবিআর এ ধরনের প্রচারণার বিষয়ে সতর্ক করেছে।
এনবিআরের বক্তব্য অনুযায়ী, আয়কর আইন, ২০২৩-এ সব তথ্য শূন্য দেখিয়ে ‘জিরো রিটার্ন’ জমা দেওয়ার কোনো বিধান নেই।
কোনো ব্যক্তির আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলেও তাঁকে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রকৃত আয়, ব্যয়, সম্পদ ও দায়ের তথ্য দিতে হবে। বাস্তব তথ্যের বিপরীতে ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল বা মিথ্যা বিবরণ দেওয়া আইনগত অপরাধ হতে পারে।
আইনের ৩১৩ ধারায় জেনেশুনে মিথ্যা বিবরণ বা হিসাব দাখিলের জন্য কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। অপরাধের প্রকৃতি ও প্রমাণের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
তাই অনলাইনে প্রচারিত কোনো সহজ সমাধান অনুসরণ না করে এনবিআরের নির্দেশনা ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী রিটার্ন জমা দেওয়া উচিত।
উপসংহার: সঠিক তথ্যই নিরাপদ আয়কর রিটার্নের ভিত্তি
আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া শুধু একটি বার্ষিক প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; এটি একজন ব্যক্তির আর্থিক অবস্থার গুরুত্বপূর্ণ নথি। তাই তাড়াহুড়ো করে রিটার্ন জমা না দিয়ে আয়, ব্যয়, সম্পদ, দায়, বিনিয়োগ এবং কর পরিশোধের তথ্য ভালোভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে আগের বছরের রিটার্নের সঙ্গে বর্তমান বছরের সম্পদ ও দায়ের পরিবর্তন মিলিয়ে দেখা, প্রতিটি আয়ের উৎসের প্রমাণ রাখা এবং কর রেয়াতের ক্ষেত্রে সঠিক তথ্য দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ছোট একটি ভুল ভবিষ্যতে ব্যাখ্যা, সংশোধন কিংবা করসংক্রান্ত জটিলতার কারণ হতে পারে। তাই রিটার্ন জমার আগে কয়েকবার তথ্য যাচাই করুন। প্রয়োজন হলে অভিজ্ঞ কর পরামর্শকের সহায়তা নিন।
মনে রাখবেন, সঠিক ও স্বচ্ছ তথ্যের ভিত্তিতে জমা দেওয়া আয়কর রিটার্নই ভবিষ্যতের অপ্রয়োজনীয় কর জটিলতা এড়ানোর সবচেয়ে ভালো উপায়।
Sources / তথ্যসূত্র
নিচের নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো ব্যবহার করে তথ্য যাচাই করা হয়েছে।
-
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) — আয়করসংক্রান্ত সরকারি FAQ ও রিটার্ন জমার নির্দেশনা। NBR Income Tax FAQ।
-
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) — আয়কর আইন, ২০২৩ এবং সংশোধিত বিধান। Income Tax Act, 2023 (PDF)।
-
The Business Standard — Income tax returns: Some key considerations and common pitfalls, ২৪ অক্টোবর ২০২৬। সম্পূর্ণ প্রতিবেদন।
-
Bangladesh Sangbad Sangstha (BSS) — ২০২৬-২৭ করবর্ষের ই-রিটার্ন চালু এবং অনলাইন রিটার্ন জমার নিয়ম, ২২ জুলাই ২০২৬। BSS প্রতিবেদন।
-
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) — জিরো রিটার্ন বিষয়ে সতর্কতা ও প্রকৃত তথ্য প্রদানের নির্দেশনা। NBR-এর সতর্কবার্তা।
-
বাংলাদেশ আইন মন্ত্রণালয়ের আইনভান্ডার — আয়কর আইন, ২০২৩-এর সংশ্লিষ্ট ধারা। আইনের বিস্তারিত।
