পাহাড়ের ঢালে সোনালি জুমের ধান, উৎসবমুখর পাহাড়ি জনপদ।

পাহাড়ি জনপদে নবান্নের উৎসব: প্রকৃতি, নতুন ফসল ও ঐতিহ্যে গ্রামীণ জীবনের নতুন আমেজ

আপডেট : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১৮:৩৫

পাহাড়ি জনপদে নবান্ন: জুমের ফসল, প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের উৎসব

হেমন্তের শেষভাগে প্রকৃতিতে যখন শীতের আগমনী বার্তা, তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদেও দেখা যায় ভিন্ন এক কর্মচাঞ্চল্য। পাহাড়ের ঢালে পেকে ওঠা ধান, জুমের মাঠে ব্যস্ত কৃষক, ঘরে ঘরে নতুন ফসল তোলার প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। নতুন ধানের ঘ্রাণ আর ফসল ঘরে তোলার আনন্দে মুখর হয়ে ওঠে পাহাড়ের বিভিন্ন পাড়া ও গ্রাম।

বাংলার চিরায়ত নবান্ন উৎসবের সঙ্গে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ফসল ঘিরে থাকা ঐতিহ্যের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। তবে পাহাড়ের নবান্ন কেবল নতুন ধান খাওয়ার আয়োজন নয়; এটি প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা, কৃষিশ্রমের স্বীকৃতি, পারিবারিক বন্ধন এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও প্রতিফলন। বিশেষ করে জুমচাষনির্ভর পরিবারগুলোর কাছে নতুন ফসল ঘরে তোলা মানে সারা বছরের পরিশ্রমের সার্থকতা।

পাহাড়ি জনপদে নবান্ন উৎসবের বিশেষত্ব

নবান্ন শব্দের অর্থ নতুন অন্ন। নতুন ধান ঘরে তোলার পর সেই ধান থেকে তৈরি চালের প্রথম খাবার গ্রহণকে কেন্দ্র করেই বাংলার গ্রামীণ সমাজে এই উৎসবের প্রচলন। সাধারণত অগ্রহায়ণ মাসে আমন ধান কাটার পর সমতলের বিভিন্ন অঞ্চলে নবান্ন উদযাপন করা হয়।

তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের নবান্নের প্রকৃতি কিছুটা আলাদা। এখানকার অনেক জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা পাহাড়ের ঢালে পরিচালিত জুমচাষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। ফলে তাদের ফসল উৎসবের সময়, আয়োজন এবং রীতিনীতিও স্থানীয় কৃষিপদ্ধতি ও জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির ওপর নির্ভর করে।

চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, খিয়াংসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে কৃষি ও প্রকৃতিকেন্দ্রিক নানা উৎসব ও আচার প্রচলিত রয়েছে। এসব আয়োজনের সবগুলোকে একই নামে নবান্ন বলা যায় না। তবে নতুন ফসল ঘরে তোলা, খাদ্য ভাগাভাগি এবং প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মতো বিষয়গুলোতে সাংস্কৃতিক মিল রয়েছে।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যেও প্রধান ফসল ঘরে তোলাকে কেন্দ্র করে নবান্নসংশ্লিষ্ট উৎসব পালনের ঐতিহ্য রয়েছে। ম্রো জনগোষ্ঠীর চামোইনাত উৎসবও এর একটি উদাহরণ।

জুমচাষ: পাহাড়ি জীবনের ঐতিহ্য ও অর্থনীতির ভিত্তি

পাহাড়ি জনপদের নবান্ন উৎসব বুঝতে হলে আগে জানতে হবে জুমচাষ সম্পর্কে। পার্বত্য চট্টগ্রামের কৃষি, খাদ্যাভ্যাস ও সামাজিক জীবনে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে এই ঐতিহ্যবাহী কৃষিপদ্ধতি।

জুমচাষ মূলত পাহাড়ের ঢালু জমিতে পরিচালিত এক ধরনের মিশ্র ফসল উৎপাদনব্যবস্থা। প্রচলিত পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট পাহাড়ি জমির গাছপালা পরিষ্কার করে শুকানোর পর নিয়ন্ত্রিতভাবে পোড়ানো হয়। এরপর জমিতে গর্ত করে একাধিক ধরনের বীজ বপন করা হয়।

একই জমিতে ধানের পাশাপাশি ভুট্টা, তিল, তুলা, মরিচ, কুমড়া, মারফা এবং বিভিন্ন শাকসবজি চাষ করা হয়। ফলে একটি জুমক্ষেত থেকে পরিবারের খাদ্য ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের বিভিন্ন উপকরণ পাওয়া সম্ভব হয়।

জুমচাষের সময়সূচি সাধারণত ঋতু, বৃষ্টিপাত, পাহাড়ের অবস্থান এবং স্থানীয় পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। ফাল্গুন-চৈত্রে জমি প্রস্তুত এবং বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে বীজ বপনের পর কয়েক মাসের পরিচর্যা শেষে বিভিন্ন সময়ে ফসল সংগ্রহ করা হয়। সব ফসল একই সময়ে পাকে না। তাই কোনো কোনো অঞ্চলে ধান কাটার সময় আর অন্যান্য ফসল সংগ্রহের সময়ের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়।

জুমচাষের এই বৈচিত্র্যই পাহাড়ি নবান্নের আনন্দকে আরও বিশেষ করে তোলে। এখানে নতুন ফসল বলতে শুধু ধান নয়, বরং একটি পরিবারের পরিশ্রমে উৎপাদিত নানা ধরনের খাদ্যশস্য ও সবজিকেও বোঝায়।

নতুন ধান ঘরে তোলার আনন্দে মুখর পাহাড়

পাহাড়ের ঢালে জুমের ধান পেকে উঠলে শুরু হয় কৃষকদের ব্যস্ততা। কাস্তে হাতে পরিবারের সদস্যরা ধান কাটতে মাঠে যান। দুর্গম পাহাড়ি পথ দিয়ে ফসল বাড়িতে নিয়ে আসা, ধান শুকানো, মাড়াই এবং সংরক্ষণের মতো কাজগুলোতে পরিবারের সবাই অংশ নেন।

অনেক ক্ষেত্রে এসব কাজ শুধু একজন কৃষকের দায়িত্ব থাকে না। পরিবারের নারী-পুরুষসহ অন্য সদস্যরাও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা করেন। ফলে ফসল সংগ্রহের সময়টি হয়ে ওঠে সম্মিলিত পরিশ্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

জুমের ফসল ঘরে তোলার পর অনেক এলাকায় নতুন চাল দিয়ে বিশেষ খাবার তৈরি করা হয়। কোথাও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করা হয়, আবার কোথাও প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে নতুন ফসল ভাগাভাগি করা হয়।

স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস, নতুন ফসলের প্রতি সম্মান দেখানো এবং সৃষ্টিকর্তা বা প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা সমৃদ্ধ জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে এসব রীতি ও বিশ্বাস জনগোষ্ঠীভেদে আলাদা হতে পারে।

নবান্নের খাবারে পাহাড়ি সংস্কৃতির বৈচিত্র্য

নবান্ন উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হলো খাবার। নতুন ধান থেকে তৈরি ভাত, চালের গুঁড়ার পিঠা এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বিভিন্ন সবজি ও ফলমূল উৎসবের খাবারের তালিকায় বিশেষ জায়গা পায়।

পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর খাদ্যসংস্কৃতিতে স্থানীয় উপাদানের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাঁশের কচি অংশ, পাহাড়ি শাকসবজি, কুমড়া, মরিচ এবং বিভিন্ন মৌসুমি উপকরণ দিয়ে তৈরি খাবার তাদের দৈনন্দিন জীবন ও উৎসবের অংশ।

চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রোসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর রান্নার ধরন, উপকরণ এবং পরিবেশনের পদ্ধতিতে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ফলে নতুন ফসলকে কেন্দ্র করে আয়োজিত খাবারের অনুষ্ঠানেও দেখা যায় সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য।

এখানে খাবার কেবল ক্ষুধা মেটানোর উপকরণ নয়; বরং এটি পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক সম্প্রীতি এবং ঐতিহ্য ধরে রাখার একটি মাধ্যম। নতুন চাল দিয়ে তৈরি খাবার আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে।

নবান্নের সঙ্গে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব উৎসবের সম্পর্ক

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর উৎসব সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—পাহাড়ের সব উৎসব নবান্ন নয়। অনেক উৎসবের সঙ্গে নতুন বছর, ঋতু পরিবর্তন, ধর্মীয় বিশ্বাস কিংবা কৃষিকাজের বিশেষ পর্যায়ের সম্পর্ক রয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে চাকমাদের বিজু, মারমাদের সাংগ্রাই এবং ত্রিপুরাদের বৈসুকের কথা বলা যায়। এগুলো মূলত পুরোনো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব। সাধারণত চৈত্র মাসের শেষ দুই দিন এবং বৈশাখের প্রথম দিনকে কেন্দ্র করে এসব উৎসব পালিত হয়।

অন্যদিকে কৃষিকাজ ও ফসল সংগ্রহের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু আচার রয়েছে, যেগুলোর সময় ও ধরন ভিন্ন। চাকমাদের হাল পালানী এবং খিয়াং জনগোষ্ঠীর হেনেই উৎসবের কথাও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।

অর্থাৎ পাহাড়ি জনপদের উৎসবের জগৎ অনেক বিস্তৃত। নবান্ন সেই বৃহত্তর কৃষিনির্ভর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

প্রকৃতি, পাহাড় ও কৃষকের জীবনের নিবিড় সম্পর্ক

পাহাড়ি নবান্নের সৌন্দর্য শুধু ফসলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাহাড়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ, ঋতু পরিবর্তন এবং মানুষের জীবনযাপনের ধরন।

বর্ষায় পাহাড়ের সবুজ প্রকৃতি, ঝরনার পানির প্রবাহ, পাহাড়ি পথের সৌন্দর্য এবং হেমন্তে ধীরে ধীরে পাকা ফসলের উপস্থিতি পুরো জনপদে আলাদা আবহ তৈরি করে। প্রকৃতির এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়েই চলে পাহাড়ি কৃষকদের জীবন।

জুমচাষের ক্ষেত্রে বৃষ্টিপাতের সময় ও পরিমাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো বৃষ্টি হলে বীজ অঙ্কুরিত হয় এবং ফসলের বৃদ্ধি ভালো হয়। অন্যদিকে অনিয়মিত বৃষ্টি, অতিবৃষ্টি কিংবা দীর্ঘ খরা ফসল উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এ কারণে পাহাড়ি কৃষকদের কাছে প্রকৃতির পরিবর্তন শুধু সৌন্দর্য উপভোগের বিষয় নয়; এটি তাদের খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক জীবনের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

পাহাড়ি নবান্নের অর্থনৈতিক গুরুত্ব

নতুন ফসল ঘরে তোলার উৎসব পাহাড়ি পরিবারের অর্থনৈতিক জীবনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জুমের উৎপাদিত ধান, ভুট্টা, কুমড়া, মরিচ, তিল ও অন্যান্য কৃষিপণ্য পরিবারের খাদ্য চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বিক্রির সুযোগ তৈরি করে।

অনেক পরিবার নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত ফসল স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে। এতে পরিবারের হাতে নগদ অর্থ আসে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সুযোগ তৈরি হয়।

এ ছাড়া নবান্নকে কেন্দ্র করে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন খাবার তৈরি ও বিক্রির সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে। ঐতিহ্যবাহী খাবার, স্থানীয় কৃষিপণ্য এবং হস্তশিল্পের সঙ্গে পর্যটনের সংযোগ ঘটানো গেলে পাহাড়ি এলাকার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।

তবে এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সংস্কৃতির মর্যাদা ও জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। উৎসবকে শুধু পর্যটন আকর্ষণে পরিণত না করে এর সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ করাও জরুরি।

জুমচাষ ও নবান্নের ঐতিহ্য এখন যেসব চ্যালেঞ্জের মুখে

পাহাড়ি নবান্নের আনন্দের আড়ালে রয়েছে কিছু বাস্তব সমস্যা। বিশেষ করে জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো বর্তমানে জমির সংকট, উৎপাদন ব্যয়, আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং শ্রমিকের অভাবের মতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে।

২০২৬ সালের ৬ আগস্ট প্রকাশিত প্রথম আলোর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে পার্বত্য চট্টগ্রামে ঐতিহ্যবাহী জুমচাষের জমি সংকুচিত হওয়া, জমির উর্বরতার ওপর চাপ এবং নতুন প্রজন্মের কৃষিকাজ থেকে সরে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনটিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়েছে, বান্দরবানে ২০২০-২১ অর্থবছরে জুমচাষের জমির পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ২০ হেক্টর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৮ হাজার ১৭৪ হেক্টরে। একই সময়ে রাঙামাটিতে জুমের জমি ৬ হাজার ৫১০ হেক্টর থেকে কমে ৫ হাজার ২ হেক্টর হয়েছে। খাগড়াছড়িতেও জুমের জমি ও উৎপাদন কমার তথ্য উঠে এসেছে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত

জুমচাষের সঙ্গে বৃষ্টিপাতের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। পাহাড়ের ঢালু জমিতে ফসল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় পানির প্রাপ্যতা অনেকাংশে প্রাকৃতিক বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল।

সময়ে বৃষ্টি না হলে বীজ বপন পিছিয়ে যায়। আবার অতিবৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি ও বীজ ধুয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘ সময় তাপমাত্রা বেশি থাকলেও ফসলের বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে।

প্রথম আলোর ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও নরওয়ের আবহাওয়া অধিদপ্তরের যৌথ গবেষণার তথ্য তুলে ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে তাপপ্রবাহ ও অতিভারী বৃষ্টিপাতের পরিবর্তিত প্রবণতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

জমির সংকট ও নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ

পাহাড়ি কৃষির আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো জুমচাষের উপযোগী জমির সংকোচন। ঐতিহ্যগত পদ্ধতিতে একটি জমিতে কয়েক বছর চাষের পর সেটিকে দীর্ঘ সময় পতিত রাখা হয়। এতে প্রাকৃতিকভাবে গাছপালা জন্মানোর পাশাপাশি মাটির উর্বরতা ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হয়।

কিন্তু জমির ওপর চাপ বাড়ায় অনেক এলাকায় আগের মতো দীর্ঘ সময় জমি পতিত রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মাটির গুণাগুণ ও উৎপাদনশীলতার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।

অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের অনেকেই শিক্ষা, চাকরি ও অন্যান্য পেশায় যুক্ত হচ্ছে। ফলে পারিবারিকভাবে শেখা জুমচাষের অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় কৃষিজ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।

পাহাড়ি নবান্নের ঐতিহ্য সংরক্ষণে প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ

পাহাড়ি নবান্নের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু উৎসব আয়োজন করলেই হবে না। এর সঙ্গে সম্পর্কিত কৃষি, খাদ্যসংস্কৃতি, স্থানীয় বীজ এবং জনগোষ্ঠীর নিজস্ব জ্ঞান সংরক্ষণেও গুরুত্ব দিতে হবে।

প্রথমত, জুমচাষের পরিবেশ ও স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে টেকসই কৃষিব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন। জমির উপযুক্ত আবর্তকাল বজায় রাখা, মাটির উর্বরতা সংরক্ষণ এবং পানির সঠিক ব্যবস্থাপনা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয়ত, স্থানীয় ধান ও অন্যান্য ফসলের দেশি জাত সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এসব জাত পাহাড়ি পরিবেশের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোজিত। এগুলোর সংরক্ষণ খাদ্যবৈচিত্র্য ও কৃষিজ ঐতিহ্য রক্ষায় সহায়ক হতে পারে।

তৃতীয়ত, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব উৎসব, গান, নৃত্য, খাবার ও কৃষিসংশ্লিষ্ট আচার নিয়ে গবেষণা এবং প্রামাণ্য নথি তৈরি করা প্রয়োজন। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিজেদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারবে।

এ ছাড়া স্থানীয় কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ, কৃষকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং সাংস্কৃতিক পর্যটনের ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে অর্থনৈতিকভাবেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

নতুন ফসলের উৎসব শুধু আনন্দ নয়, সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও প্রতীক

পাহাড়ি জনপদে নবান্নের উৎসব আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কৃষি কেবল খাদ্য উৎপাদনের একটি মাধ্যম নয়; এটি মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

নতুন ধানের ঘ্রাণ, জুমের ফসল, পরিবারের সম্মিলিত পরিশ্রম এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনদর্শন ফুটে ওঠে। প্রতিটি ফসলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে প্রকৃতির প্রতি নির্ভরতা এবং শ্রমের প্রতি সম্মান।

সময়ের পরিবর্তনে পাহাড়ি কৃষি ও মানুষের জীবনযাপনে নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। তবু নবান্নের মতো কৃষিনির্ভর ঐতিহ্য পাহাড়ি সমাজের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে শক্তিশালী করে রেখেছে।

তাই এই উৎসবের গুরুত্ব শুধু একটি মৌসুমি আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পাহাড়ের কৃষি, প্রকৃতি ও মানুষের ঐতিহ্যকে একসূত্রে ধরে রাখার ক্ষেত্রে নবান্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ। নতুন ফসলের আনন্দের পাশাপাশি এই ঐতিহ্য সংরক্ষণের দায়িত্বও সবার।

আরও BUZZ

আয়কর রিটার্ন জমায় ছোট ভুলে বড় ঝামেলা, যে ১০টি বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি

নতুন দুই স্মার্টফোনে চমক! Vivo V80 FE ও Redmi 17 5G-এর ফিচার, ব্যাটারি ও দাম জানুন

উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লীগ বিশ্লেষণ: নতুন ফরম্যাটে নকআউট দৌড়, কোন ক্লাবের সামনে অঘটনের শঙ্কা?

মঙ্গলে কি সত্যিই মানুষের বসবাস সম্ভব? লাল গ্রহে বসতি গড়ার বড় চ্যালেঞ্জ

শীত আসছে! শরীর সুস্থ রাখতে প্রতিদিনের ৭টি সহজ অভ্যাস