শূন্য থেকে বাংলাদেশের শিল্পপতি হওয়ার অসাধারণ গল্প

আপডেট : ২৭ নভেম্বর ২০২৫, ১৪:০৪

শেখ আকিজ উদ্দিন
শূন্য থেকে শুরু করা এক মানুষ, যিনি জীবনের কঠিন পথে হেঁটে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন কিংবদন্তি হিসেবে। শেখ আকিজ উদ্দিন, একসময়ের কমলালেবু ফেরিওয়ালা, পকেটে মাত্র ১৭ টাকা নিয়ে শুরু করেছিলেন তার জীবনের ব্যবসায়িক যাত্রা। আজ তার প্রতিষ্ঠিত আকিজ গ্রুপ "Akiz Group" বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপগুলোর একটি, যার মালিকানায় রয়েছে ২৯টি শিল্প কারখানা এবং ৫০,০০০-এরও বেশি কর্মচারী।

শেখ আকিজ উদ্দিনের জন্ম ১৯২৯ সালে খুলনার ফুলতলা উপজেলার মধ্যেডাঙ্গা গ্রামে। তার বাবা শেখ মফিজউদ্দিন ছিলেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, আর মা মাতিনা বেগম ছিলেন গৃহিণী। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার পরিবর্তে পরিবারের জীবিকা অর্জনে মনোনিবেশ করতে হয়েছিল তাকে। স্কুলে ভর্তি হলেও দারিদ্র্যের কারণে নিয়মিত পড়াশোনা করা সম্ভব হয়নি। ফলে, তিনি বাবার ক্ষুদ্র ব্যবসায় সাহায্য করতে বাধ্য হন। মা যে ২-৪ আনা জমিয়ে রেলস্টেশনে বাদাম ও লজেন্স কিনে দুই পয়সার মুনাফা করার সুযোগ দিয়েছিলেন, সেটি ছিল আকিজের প্রথম ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা।

জীবনের দারিদ্র্য এবং পরিবারের কষ্ট তাকে ঠেলে দেয় কলকাতায়। ১৯৪২ সালে, মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কলকাতায় পাড়ি জমান। কলকাতায় পকেটে ছিল মাত্র ১৭ টাকা, আর স্থায়ী আশ্রয়ও ছিল না। ফলে তিনি শিয়ালদহ রেলস্টেশনে রাত কাটাতে বাধ্য হন। জমানো টাকা শেষ হয়ে আসার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন অল্প পুঁজি দিয়ে ব্যবসা শুরু করবেন। প্রথমে কমলা লেবু বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করতে থাকেন। স্বল্প লাভ সত্ত্বেও তার কঠোর পরিশ্রম এবং দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি তাকে কিছু অর্থ সঞ্চয় করতে সাহায্য করে।

শুধুমাত্র কমলার ব্যবসা নয়, কলকাতায় ঠেলা গাড়িতে মনিহারির সামগ্রী বিক্রিও শুরু করেন। ছোট ব্যবসাগুলো ধীরে ধীরে তাকে আত্মবিশ্বাস দেয়। তবে কলকাতার কঠিন পরিবেশ এবং আইনি জটিলতায় তিনি একাধিকবার বাধাপ্রাপ্ত হন। অনুমতি ছাড়া রাস্তায় দোকান সাজানোর জন্য পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে, এবং তিন দিনের জেল খাটতে হয়। এই প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও শেখ আকিজ উদ্দিন কখনো দমে যাননি।

কিছুদিন পর কলকাতায় তার অবস্থার উন্নতি হলেও তিনি সিদ্ধান্ত নেন নিজের দেশে ফিরে আসবেন। নিজ দেশে ফিরে, খুলনায় নতুনভাবে জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেন। খুলনায় ফিরে তিনি তার পুরনো বন্ধু নিতাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। নিতাইয়ের পিতা বিধু বাবু তখন বিড়ি তৈরির ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। শেখ আকিজ উদ্দিন বিধু বাবুর কাছ থেকে বিড়ি ব্যবসার সমস্ত কলাকৌশল শিখতে থাকেন। বন্ধু নিতাইয়ের সঙ্গে তামাক কেনা ও বিড়ি তৈরির প্রক্রিয়া দ্রুত আয়ত্ত করেন।

মায়ের মৃত্যুর পর, তাঁর শেষ ইচ্ছা পূরণে তিনি বিয়ে করেন ছকিনা খাতুনকে। শশুরের ইচ্ছায় স্থানীয় বাজারে মুদির দোকান খুলে দেন। গ্রামীণ হাটে দোকানে বিড়ি আসর বসতে দেখে নিজেই বিড়ি তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন। কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি তিন জন কর্মচারী নিয়ে আকিজ বিড়ি কারখানা চালু করেন।

শুরুতে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকলেও, আকিজ বিড়ির স্বাদ, গন্ধ এবং বিপণন কৌশলে জোর দিয়ে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তবে তার এই সাফল্য তাকে অনেক ব্যবসায়িক ঈর্ষা ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি করে। এক সন্ধ্যায় দোকানে আগুন লেগে তার সমস্ত পুঁজি পুড়ে যায়। পথে বসে যান আকিজ উদ্দিন। কিন্তু দমে না গিয়ে নিজের জমানো ৩০ হাজার টাকা দিয়ে ব্যবসা পুনরায় শুরু করেন।

১৯৫৬ সালে আকিজ একটি বেবি ট্যাক্সি কিনে নিজ হাতে বাজারে পণ্য সরবরাহ শুরু করেন। ধীরে ধীরে ব্যবসার পরিধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আকিজ বিড়ি দেশের বিভিন্ন স্থানে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিড়ি ব্যবসা থেকে প্রাপ্ত লাভের টাকা তিনি আরও বড় ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে শুরু করেন।

৬০-এর দশকের শেষের দিকে তিনি পাট ব্যবসায় প্রবেশ করেন। পাট তখন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক পণ্য। বিড়ি ব্যবসার লাভ দিয়ে পাট ব্যবসায় বিনিয়োগ শুরু করেন। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে ব্যবসা দ্রুত সাফল্য অর্জন করে। তবে তার ব্যবসায়িক অংশীদার ২ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে আর কখনো অংশীদারী ব্যবসায় যোগ দেননি।

পাট ব্যবসার সাফল্য তাঁকে নতুন খাতে বিনিয়োগের উদ্দীপনা দেয়। ১৯৭০ সালে বন্ধুদের সহায়তায় ৫ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ব্যবসা আরও সম্প্রসারণ করেন।

১৯৭৭ সালে সরকার লোকসানে চলা ঢাকা টোবাকো ইন্ডাস্ট্রিজ বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়। আকিজ উদ্দিন ৮৩ লক্ষ টাকা দিয়ে এর মালিকানা ক্রয় করেন এবং লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলেন। ১৯৭৮ সালে ঢাকা টোবাকো ইন্ডাস্ট্রিজ দেশের মধ্যে তৃতীয় বৃহৎ কারখানা হিসেবে পরিচিতি পায়। ২০১৮ সালে আকিজের তামাক বিভাগ প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকায় জাপান টোবাকোকে বিক্রি করা হয়, যা ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ।

৮০-এর দশকে শেখ আকিজ উদ্দিন চামড়াশিল্পে প্রবেশ করেন। সংকটাপন্ন “Scottish And Family” প্রতিষ্ঠানটি ক্রয় করে তিনি নতুন প্রযুক্তি ও দক্ষ শ্রমিক দিয়ে SAF Leather প্রতিষ্ঠা করেন, যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে সাফল্য অর্জন করে।

১৯৯২ সালে তিনি ছেলের হাতে দায়িত্ব তুলে দেন প্রথম ম্যাচ ফ্যাক্টরি, যা দেশের প্রথম অটোমেটেড মেশিনে উৎপাদিত ম্যাচ তৈরি করে।

ঢাকার ধামরাইয়ে ৫০ একর জমিতে ছেলে শেখ বশির উদ্দিনের সঙ্গে Akij Food & Beverage Ltd প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম পণ্য ছিল Farm Fresh দুধ, যা বাজারে ব্যাপক সাড়া ফেলে। পরবর্তীতে ফ্রুটিকা ও মোজোসহ আরও জনপ্রিয় পণ্য বাজারে আসে।

আজকের আকিজ গ্রুপ নেতৃত্ব দিচ্ছে কাগজ, বোর্ড, টেক্সটাইল, সিমেন্ট, সিরামিক, খাদ্যপণ্য ও নির্মাণসামগ্রীসহ বহু খাতে। মৃত্যুর সময় আকিজ গ্রুপের অধীনে ছিল ৫০,০০০+ কর্মী এবং প্রায় ২৯টি শিল্প প্রতিষ্ঠান। ২০০৯ সালের মোট সম্পদ ছিল প্রায় ৮৯ বিলিয়ন টাকা।

শেখ আকিজ উদ্দিন দানশীলতার জন্যও পরিচিত ছিলেন। Ad-din Foundation প্রতিষ্ঠা করে তিনি স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় অবদান রেখেছেন। দরিদ্র মানুষের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা, স্কুল-কলেজ এবং অন্যান্য সেবা প্রদান করে সমাজে বিশেষ ভূমিকা রাখেন।

২০০৬ সালের ২৭ অক্টোবর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার উত্তরাধিকারীরা বর্তমানে আকিজ গ্রুপ পরিচালনায় নিয়োজিত এবং শিল্প সাম্রাজ্যকে আরও সম্প্রসারণ করছেন।

শেখ আকিজ উদ্দিনের জীবন প্রমাণ করে, শূন্য থেকে শুরু করেও দৃঢ় পরিশ্রম, ধৈর্য ও সৎ নেতৃত্বে একজন মানুষ দেশের অর্থনীতি ও সমাজে বিশাল অবদান রাখতে পারে।

পিরামিড: মরুর বুকে লেখা অমরত্বের গল্প

Lucifer: The God Who Chose to Walk

ঢাকায় সাম্প্রতিক ভূমিকম্প: ইতিহাস, ঝুঁকি ও প্রস্তুতির বাস্তবতা

ঝগড়ার পর ভুলেও যেসব কাজ করবেন না ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে

ঘরেই বানাতে পারেন ওয়াফেল

বিমান ওঠা-নামার সময় জানালা খোলা রাখার কারণ

আরও BUZZ

সেশ্যেলস আইল্যান্ডে নেচার ট্রেইল চ্যালেঞ্জের তৃতীয় আসর

সিটি অব গড সিনেমা: ব্রাজিলের ফাভেলা অপরাধ ও দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতা

আজকের খেলার সময়সূচি

আজকের যত খেলা

পিরামিড: মরুর বুকে লেখা অমরত্বের গল্প