প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের জীবন, জীবিকা ও সম্পদের ওপর নিমেষেই আঘাত হানতে পারে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, বজ্রপাত ও ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রতিটি পরিবার ও ব্যক্তির আগাম সচেতনতা সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
আজ, ১৩ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস ২০২৬। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের এবারের বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট—একটি দুর্যোগ-সহনশীল দেশ গড়ে তোলার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় নিজের ঘর থেকেই।
কেন এই দিবসটি এত তাৎপর্যপূর্ণ?
প্রতি বছর ১৩ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয় দুর্যোগের ঝুঁকি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে। দুর্যোগকে হয়তো সম্পূর্ণ থামানো সম্ভব নয়, তবে চারটি জিনিস নিশ্চিত করা গেলে ক্ষয়ক্ষতি ৯০% পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব:
-
আগাম নির্ভরযোগ্য সতর্কতা
-
পরিকল্পিত পারিবারিক প্রস্তুতি
-
নিরাপদ অবকাঠামো ও সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ
দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রতিটি পরিবারের ৫টি জরুরি প্রস্তুতি
১. পারিবারিক জরুরি পরিকল্পনা
পরিবারের সবাইকে নিয়ে বসে ঠিক করুন বিপদের মুহূর্তে কে কী করবেন।
-
ঘর থেকে নিরাপদে বের হওয়ার বিকল্প পথ চিহ্নিত রাখুন।
-
নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন বা সদস্যরা আলাদা হয়ে গেলে কোথায় গিয়ে মিলিত হবেন, তা আগে থেকেই ঠিক করে রাখুন।
-
পরিবারের শিশু, বয়োজ্যেষ্ঠ ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সদস্যদের সুরক্ষায় আলাদা পরিকল্পনা রাখুন।
২. একটি 'Go-Bag' বা জরুরি ব্যাগ গুছিয়ে রাখা
বিপদের মুখে হাতড়ে বেড়ানোর সময় থাকে না। দরজার কাছে একটি হালকা ব্যাগে সবসময় প্রস্তুত রাখুন:
-
বোতলজাত বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবার (চিঁড়া, বিস্কুট, বাদাম ইত্যাদি)
-
জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রী (ফার্স্ট এইড) ও প্রেসক্রিপশনের নিয়মিত ওষুধ
-
টর্চলাইট, অতিরিক্ত ব্যাটারি, পাওয়ার ব্যাংক ও একটি বাঁশি (সংকেত দেওয়ার জন্য)
-
প্রয়োজনীয় জাতীয় পরিচয়পত্র, জমির কাগজ বা দলিলের ওয়াটারপ্রুফ কপি
৩. নির্ভরযোগ্য সতর্কবার্তা অনুসরণ
গুজবে কান না দিয়ে কেবল আবহাওয়া অধিদপ্তর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ও জাতীয় সংবাদমাধ্যমের আপডেট অনুসরণ করুন। সংকেত বাড়লে শেষ মুহূর্তের জন্য বসে না থেকে আগেই আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যান।
৪. ঘরের ভেতরের ঝুঁকি দূর করা
-
ঘরের গ্যাস লাইন ও বৈদ্যুতিক ওয়্যারিং নিয়মিত পরীক্ষা করুন।
-
ভারী আসবাব বা বুকশেলফ দেয়ালের সাথে শক্ত করে আটকে রাখুন, যেন ভূমিকম্পে উল্টে না পড়ে।
-
বের হওয়ার মূল পথ বা সিঁড়ি সবসময় ফাঁকা রাখুন।
৫. শিশুদের সচেতন ও প্রস্তুত করা
শিশুদের সহজ ভাষায় শেখান বিপদের সময় কোথায় দাঁড়াতে হবে এবং কীভাবে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করতে হবে। ভয় না দেখিয়ে আত্মবিশ্বাসী করে তোলাই প্রস্তুতির মূল লক্ষ্য।
৩টি প্রধান দুর্যোগে তাৎক্ষণিক করণীয়
-
ভূমিকম্পের সময়: ঘরের ভেতরে থাকলে মজবুত টেবিল বা খাটের নিচে আশ্রয় নিন (Drop, Cover, and Hold On)। মাথা ও ঘাড় সুরক্ষিত রাখুন। কম্পন চলাকালে জানালা ও কাচ থেকে দূরে থাকুন এবং লিফট ব্যবহার করবেন না।
-
বন্যার সময়: দ্রুত শুকনো ও উঁচু স্থানে চলে যান। বন্যার পানিতে হাঁটা বা গাড়ি চালানো সম্পূর্ণ পরিহার করুন—পানির তীব্র স্রোত বা নিচে খোলা ম্যানহোল প্রাণঘাতী হতে পারে। পানিতে ডুবে থাকা বৈদ্যুতিক তার থেকে দূরে থাকুন।
-
ঘূর্ণিঝড়ের সময়: সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার নির্দেশ এলে কালক্ষেপণ করবেন না। ঘরের দরজা-জানালা মজবুতভাবে আটকে রাখুন এবং ঝড় চলাকালে কোনো অবস্থাতেই বাইরে বের হবেন না।
সচেতনতাই নিরাপত্তার প্রথম ঢাল
দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি কোনো নির্দিষ্ট একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি দৈনন্দিন জীবনযাত্রার একটি অংশ। নিজের বাড়িকে সুরক্ষিত রাখা এবং পরিবারকে সচেতন করাই একটি দুর্যোগ-সহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলার সবচেয়ে কার্যকর সূচনা।
