নানা পাটেকরের অজানা গল্প

নানা পাটেকর: অভিনয়জীবন, জনপ্রিয় সিনেমা, ব্যক্তিগত জীবন ও সংগ্রামের গল্প

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:৪৭

ভারতীয় চলচ্চিত্রে এমন কিছু অভিনেতা আছেন, যাঁদের পর্দায় দেখলেই আলাদা করে পরিচয় দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। তাঁদের কণ্ঠস্বর, সংলাপ বলার ধরন, চোখের অভিব্যক্তি এবং চরিত্রের গভীরে পৌঁছে যাওয়ার ক্ষমতাই তাঁদের আলাদা পরিচয় তৈরি করে। নানা পাটেকর ছিলেন এমনই একজন স্বতন্ত্র অভিনেতা।

প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়জীবনে হিন্দি ও মারাঠি চলচ্চিত্রে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। Gaman, Parinda, Krantiveer, Agni Sakshi, Khamoshi: The Musical, Ab Tak Chhappan, Welcome এবং Natsamrat—বিভিন্ন ঘরানার সিনেমায় তাঁর অভিনয় দর্শকদের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেয়।

তাঁর অভিনয়ের বিশেষত্ব ছিল চরিত্রকে শুধু পর্দায় উপস্থাপন করা নয়, বরং চরিত্রের আবেগ, রাগ, কষ্ট, দ্বন্দ্ব ও মানসিক অবস্থাকে দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা। গুরুগম্ভীর চরিত্রের পাশাপাশি কমেডিতেও তিনি নিজের স্বতন্ত্র দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন।

২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর ৭৫ বছর বয়সে নানা পাটেকরের মৃত্যুতে ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। হাসপাতাল সূত্র অনুযায়ী, গোয়ার বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে তাঁর মৃত্যু হয়।

অভিনয়ের শক্তিশালী অভিব্যক্তিতে নানা পাটেকর
নানা পাটেকর কে ছিলেন?

নানা পাটেকরের আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকর। ১৯৫১ সালে মহারাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া এই অভিনেতা প্রথমে মারাঠি থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তীতে চলচ্চিত্রে প্রবেশ করে হিন্দি ও মারাঠি—দুই ভাষার সিনেমাতেই নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন।

থিয়েটারের অভিজ্ঞতা তাঁর অভিনয়শৈলীকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। মঞ্চে অভিনয়ের সময় সংলাপ, শরীরী ভাষা ও অভিব্যক্তির যে অনুশীলন তিনি করেছিলেন, পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্রে তার স্পষ্ট ছাপ দেখা যায়।

নানা পাটেকর কখনো শুধু প্রচলিত নায়ক হওয়ার প্রতিযোগিতায় নিজেকে আটকে রাখেননি। বরং শক্তিশালী চরিত্র, নেতিবাচক চরিত্র, পুলিশ কর্মকর্তা, সৈনিক, রাজনীতিক, সাধারণ মানুষ কিংবা কমেডি চরিত্র—সব ধরনের ভূমিকায় নিজেকে প্রমাণ করেছেন।

সংগ্রাম থেকেই শুরু হয়েছিল নানা পাটেকরের পথচলা

নানা পাটেকরের সাফল্যের গল্পের পেছনে ছিল কঠিন সংগ্রাম। চলচ্চিত্রে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে তাঁকে জীবিকার জন্য নানা ধরনের কাজ করতে হয়েছে।

তাঁর জীবনের শুরুর দিকের আর্থিক সংকট নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, তিনি সিনেমার পোস্টার ও জেব্রা ক্রসিং আঁকার কাজও করেছিলেন। একসময় খুব অল্প পারিশ্রমিকে কাজ করে পরিবারকে সহায়তা করতে হয়েছে তাঁকে।

এই অভিজ্ঞতাগুলো পরবর্তী সময়ে তাঁর ব্যক্তিত্বকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। চলচ্চিত্রে বড় তারকা হওয়ার পরও জীবনের সেই কঠিন সময়গুলো তিনি ভুলে যাননি।

তাঁর জীবন তাই শুধু একজন অভিনেতার সাফল্যের গল্প নয়; বরং সীমাবদ্ধতা, পরিশ্রম ও নিজের প্রতিভার ওপর বিশ্বাস রেখে এগিয়ে যাওয়ার গল্প।

নানা পাটেকরের বিখ্যাত কিছু সিনেমা

চলচ্চিত্রে নানা পাটেকরের অভিষেক

১৯৭৮ সালের Gaman সিনেমার মাধ্যমে নানা পাটেকরের চলচ্চিত্রজীবনের সূচনা হয়। এরপর ধীরে ধীরে তিনি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেতে থাকেন।

প্রথমদিকে তাঁর ক্যারিয়ার ছিল মূলধারার তারকাখ্যাতির চেয়ে চরিত্রনির্ভর সিনেমাকেন্দ্রিক। এই সময়ের কাজগুলো তাঁকে একজন সিরিয়াস অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়।

পরবর্তী সময়ে Salaam Bombay! তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মীরা নায়ারের এই সিনেমা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল এবং নানা পাটেকরের অভিনয়ও আলোচিত হয়।

‘Parinda’ দিয়ে বড় পরিচিতি

নানা পাটেকরের ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিনেমা Parinda। ১৯৮৯ সালের এই চলচ্চিত্রে তিনি অপরাধজগতের ‘আন্না’ চরিত্রে অভিনয় করেন।

চরিত্রটির ভয়ংকর ব্যক্তিত্ব, সংলাপ বলার ধরন এবং মানসিক জটিলতা নানা পাটেকরকে দর্শকের কাছে আরও শক্তিশালী অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

Parinda-এর অভিনয় তাঁর ক্যারিয়ারে বড় মাইলফলক হয়ে ওঠে এবং তাঁর অভিনয়ের স্বীকৃতিও বাড়তে থাকে।

‘Krantiveer’ ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার

নানা পাটেকরের অভিনয়জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়গুলোর একটি হলো Krantiveer।

১৯৯৪ সালের এই সিনেমায় তাঁর অভিনয় দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। চরিত্রটির রাগ, প্রতিবাদ, আবেগ ও সামাজিক বার্তা তিনি অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।

এই অভিনয়ের জন্য তিনি National Film Award for Best Actor অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর অভিনয় তাঁকে ভারতের অন্যতম সম্মানিত চরিত্রাভিনেতাদের একজন করে তোলে।

‘Agni Sakshi’ ও অভিনয়ের বৈচিত্র্য

১৯৯৬ সালের Agni Sakshi সিনেমায় নানা পাটেকর আবারও তাঁর অভিনয়ের গভীরতা দেখান। এই সিনেমার জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা পার্শ্ব অভিনেতার স্বীকৃতি পান।

একই সময়ে Khamoshi: The Musical-এর মতো সিনেমায় তাঁর অভিনয় দেখিয়ে দেয় যে তিনি শুধু তীব্র ও কঠিন চরিত্রেই সীমাবদ্ধ নন। আবেগনির্ভর চরিত্রেও তাঁর অভিনয়ের শক্তি ছিল অসাধারণ।

নানা পাটেকরের জনপ্রিয় সিনেমা

দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নানা পাটেকর বহু স্মরণীয় সিনেমায় অভিনয় করেছেন। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—

১. Gaman

১৯৭৮ সালের এই সিনেমার মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের সূচনা হয়।

২. Salaam Bombay!

মীরা নায়ারের পরিচালিত এই সিনেমা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশংসিত হয় এবং নানা পাটেকরের পরিচিতি আরও বাড়িয়ে দেয়।

৩. Parinda

‘আন্না’ চরিত্রে তাঁর শক্তিশালী অভিনয় এই সিনেমাকে তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

৪. Prahaar: The Final Attack

১৯৯১ সালের এই সিনেমায় অভিনয়ের পাশাপাশি নানা পাটেকর পরিচালক হিসেবেও কাজ করেন। এটি তাঁর বহুমুখী প্রতিভার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

৫. Tirangaa

দেশাত্মবোধ ও অ্যাকশনধর্মী এই সিনেমায় তাঁর অভিনয় দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

৬. Krantiveer

এই সিনেমার জন্য তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে সেরা অভিনেতার স্বীকৃতি পান।

৭. Khamoshi: The Musical

আবেগনির্ভর এই সিনেমায় তাঁর অভিনয় তাঁর বহুমুখী প্রতিভার আরেকটি দিক তুলে ধরে।

৮. Ab Tak Chhappan

একজন কঠোর পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রে নানা পাটেকরের অভিনয় সিনেমাটিকে বিশেষ পরিচিতি দেয়।

৯. Welcome

গম্ভীর ও তীব্র চরিত্রের পাশাপাশি কমেডিতেও তাঁর দক্ষতার প্রমাণ মেলে ‘উদয় শেঠি’ চরিত্রে।

১০. Natsamrat

মারাঠি চলচ্চিত্রের অন্যতম আলোচিত এই সিনেমায় একজন অবসরপ্রাপ্ত মঞ্চ অভিনেতার চরিত্রে তাঁর অভিনয় ব্যাপক প্রশংসিত হয়।

নানা পাটেকরের ব্যক্তিগত জীবন

নানা পাটেকর তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন সাধারণত প্রচারের আলো থেকে দূরে রাখতেন। স্ত্রী নীলকান্তি পাটেকরও অভিনয় ও থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দুজনের পরিচয় হয়েছিল মারাঠি থিয়েটারের সূত্রে এবং ১৯৭৮ সালে তাঁদের বিয়ে হয়।

তাঁদের দাম্পত্য জীবনে কঠিন সময়ও এসেছে। তাঁদের প্রথম সন্তান অল্প বয়সেই মারা যায়। পরে তাঁদের আরেক ছেলে মালহার পাটেকর জন্মগ্রহণ করেন। নানা পাটেকর ও নীলকান্তি দীর্ঘদিন আলাদা থাকলেও তাঁদের আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য রয়েছে।

মালহার চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং বাবার বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নানা পাটেকরের ব্যক্তিগত জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর সরলতা। বিশাল তারকাখ্যাতি অর্জনের পরও তিনি জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাপনের চেয়ে সাধারণ জীবন, কৃষিকাজ ও প্রকৃতির কাছাকাছি থাকাকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।

কৃষিকাজ ও গ্রামের জীবনের প্রতি ভালোবাসা

চলচ্চিত্রের বাইরে নানা পাটেকরের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল কৃষিকাজ।

মহারাষ্ট্রে তাঁর ফার্মহাউসে তিনি নিজে কৃষিকাজ করতেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, সেখানে ধান, গমসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করতেন তিনি। গরু, বলদসহ বিভিন্ন পশুপাখির সঙ্গেও তাঁর সময় কাটত।

গ্ল্যামার ও চলচ্চিত্রের ব্যস্ততার বাইরে এই গ্রামীণ জীবনই তাঁকে মানসিক শান্তি দিত। নিজের হাতে চাষ করা, রান্না করা এবং বন্ধুদের খাবার খাওয়ানো ছিল তাঁর পছন্দের কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই জীবনযাপন তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে—খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছেও তিনি নিজের শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রেখেছিলেন।

কৃষক ও মানুষের জন্য সামাজিক কর্মকাণ্ড

নানা পাটেকরের সামাজিক কর্মকাণ্ডও তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মহারাষ্ট্রের খরাপ্রবণ অঞ্চলের কৃষকদের সহায়তা, কৃষক আত্মহত্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহযোগিতা এবং গ্রামীণ উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন।

২০১৫ সালে অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে তিনি NAAM Foundation প্রতিষ্ঠা করেন। সংগঠনটি কৃষক ও গ্রামীণ মানুষের সহায়তা, জলসংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি গ্রামীণ উন্নয়নের কাজে যুক্ত ছিল।

কৃষকদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি বিধবা নারীদের স্বাবলম্বী করতে সেলাই মেশিন দেওয়ার মতো উদ্যোগের কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।

তাঁর সামাজিক কাজের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল—তিনি এসব কর্মকাণ্ডকে নিজের তারকাখ্যাতির প্রচারণার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে চাইতেন না।

নানা পাটেকরের অভিনয়ের বিশেষত্ব

নানা পাটেকরের অভিনয়শৈলী তাঁকে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্য অভিনেতাদের থেকে আলাদা করেছে।

তাঁর অভিনয়ের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—

  • শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর

  • সংলাপ বলার নিজস্ব ধরন

  • চোখ ও মুখের অভিব্যক্তির ব্যবহার

  • চরিত্রের মানসিক দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তোলা

  • তীব্র আবেগ প্রকাশের ক্ষমতা

  • সিরিয়াস ও কমেডি—দুই ধরনের চরিত্রে দক্ষতা

  • প্রচলিত নায়ক-ইমেজের বাইরে গিয়ে অভিনয়

তাঁর অভিনয় সম্পর্কে সমসাময়িক শ্রদ্ধাঞ্জলিতেও কণ্ঠস্বর, তীব্রতা ও অভিনয়ের স্বাতন্ত্র্য বিশেষভাবে উঠে এসেছে।

নানা পাটেকরের পুরস্কার ও সম্মান

দীর্ঘ অভিনয়জীবনে নানা পাটেকর ভারতের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন।

তাঁর উল্লেখযোগ্য অর্জনের মধ্যে রয়েছে—

  • ৩টি National Film Award

  • একাধিক Filmfare Award

  • Filmfare Marathi Award

  • Padma Shri — ২০১৩

ভারতীয় চলচ্চিত্রে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৩ সালে তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করা হয়। তাঁর তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার তাঁর অভিনয়জীবনের অন্যতম বড় অর্জন।

অভিনয়ের বাইরেও নানা পাটেকর

নানা পাটেকরের পরিচয় শুধু অভিনেতা হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন পরিচালক, থিয়েটারকর্মী, কৃষির সঙ্গে যুক্ত একজন মানুষ এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় একজন ব্যক্তি।

চলচ্চিত্রের বাইরের জীবনেও তিনি নিজের শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রেখেছিলেন। কৃষিকাজ, রান্না, গ্রামীণ মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো এবং কৃষকদের সহায়তা—এসব ছিল তাঁর ব্যক্তিজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এই কারণেই নানা পাটেকরের জীবনকে শুধু ‘বলিউড তারকার জীবন’ হিসেবে দেখলে তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়।

শেষ সময়েও অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা

দীর্ঘ ক্যারিয়ারের শেষ দিকেও নানা পাটেকর অভিনয় থেকে পুরোপুরি দূরে সরে যাননি। বয়স বাড়লেও বিভিন্ন চলচ্চিত্র ও প্রকল্পে তাঁকে দেখা গেছে।

প্রায় পাঁচ দশকের এই ক্যারিয়ার দেখিয়েছে, অভিনয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল দীর্ঘস্থায়ী। বিভিন্ন সময়ের সিনেমায় ভিন্ন ভিন্ন চরিত্র গ্রহণ করে তিনি নিজের অভিনয়ের পরিসরকে বারবার নতুন করে দেখিয়েছেন।

নানা পাটেকরের মৃত্যু

২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর ৭৫ বছর বয়সে নানা পাটেকরের মৃত্যু হয়। তিনি গোয়ার বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়ার পর হাসপাতালে নেওয়া হন। হাসপাতাল সূত্র অনুযায়ী, কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের পর চিকিৎসকেরা তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু তাঁকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

তাঁর ছেলে মালহার পাটেকরও মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন। নানা পাটেকরের মৃত্যুতে ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে ব্যাপক শোকের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অভিনেতা অক্ষয় কুমারসহ সহকর্মীরা তাঁর অভিনয় ও ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

নানা পাটেকরের উত্তরাধিকার

একজন অভিনেতার জনপ্রিয়তা শুধু তাঁর অভিনীত সিনেমার সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। কিছু শিল্পী তাঁদের অভিনয়ের ধরন, ব্যক্তিত্ব এবং চরিত্র নির্মাণের মাধ্যমে একটি প্রজন্মের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেন। নানা পাটেকর তাঁদেরই একজন।

তিনি দেখিয়েছেন, একজন অভিনেতার শক্তি শুধু নায়কোচিত চেহারা বা তারকাখ্যাতিতে নয়; বরং অভিনয়ের গভীরতা, চরিত্র বোঝার ক্ষমতা এবং নিজের স্বতন্ত্রতা ধরে রাখার মধ্যেও একজন শিল্পীর প্রকৃত শক্তি লুকিয়ে থাকে।

Parinda থেকে Krantiveer, Ab Tak Chhappan থেকে Welcome, আবার Natsamrat—বিভিন্ন সময়ে নানা পাটেকরের অভিনয় তাঁর বহুমুখী প্রতিভার পরিচয় দিয়েছে।

অন্যদিকে, চলচ্চিত্রের বাইরের তাঁর সরল জীবন, কৃষিকাজ এবং কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তৈরি করেছে।

নানা পাটেকরের সংগ্রাম থেকে সাফল্যের যাত্রা তাই শুধু একজন অভিনেতার গল্প নয়। এটি প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই, নিজের পরিচয় তৈরি করা এবং সাফল্যের পরও নিজের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকার গল্প।

নানা পাটেকর সম্পর্কে FAQ

নানা পাটেকরের আসল নাম কী?

নানা পাটেকরের আসল নাম বিশ্বনাথ পাটেকর।

নানা পাটেকর কবে অভিনয় শুরু করেন?

মারাঠি থিয়েটারের মাধ্যমে তাঁর অভিনয়জীবনের শুরু। ১৯৭৮ সালের Gaman সিনেমার মাধ্যমে তাঁর চলচ্চিত্রজীবন শুরু হয়।

নানা পাটেকরের জনপ্রিয় সিনেমা কোনগুলো?

Parinda, Krantiveer, Tirangaa, Agni Sakshi, Ab Tak Chhappan, Welcome, Natsamrat এবং Salaam Bombay! তাঁর উল্লেখযোগ্য সিনেমাগুলোর মধ্যে রয়েছে।

নানা পাটেকর কতটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন?

তিনি মোট তিনটি National Film Award পেয়েছেন।

নানা পাটেকর কি পরিচালক ছিলেন?

হ্যাঁ। Prahaar: The Final Attack সিনেমার মাধ্যমে তিনি পরিচালক হিসেবেও কাজ করেছেন।

নানা পাটেকরের স্ত্রী কে ছিলেন?

নানা পাটেকর ১৯৭৮ সালে অভিনেত্রী ও থিয়েটারকর্মী নীলকান্তি পাটেকরকে বিয়ে করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁরা আলাদা থাকতেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নানা পাটেকরের ছেলে কে?

তাঁর জীবিত ছেলে মালহার পাটেকর। তাঁদের প্রথম সন্তান অল্প বয়সে মারা যায়।

নানা পাটেকর কি কৃষিকাজ করতেন?

হ্যাঁ। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি কৃষিকাজের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন এবং নিজের ফার্মে বিভিন্ন ফসল চাষ করতেন।

নানা পাটেকর কি সামাজিক কাজ করতেন?

হ্যাঁ। কৃষক ও তাঁদের পরিবারের সহায়তা, জলসংরক্ষণ এবং গ্রামীণ উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। NAAM Foundation-এর সঙ্গেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

নানা পাটেকর কবে মারা যান?

২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর, ৭৫ বছর বয়সে নানা পাটেকরের মৃত্যু হয়। হাসপাতাল সূত্র অনুযায়ী মৃত্যুর কারণ ছিল কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট।

নানা পাটেকরের জীবন শুধু একজন সফল অভিনেতার জীবনী নয়। এটি সংগ্রাম, প্রতিভা, অধ্যবসায় এবং নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করার গল্প।

মঞ্চ থেকে চলচ্চিত্র, চরিত্রাভিনেতা থেকে জাতীয় পুরস্কারজয়ী শিল্পী—দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তিনি ভারতীয় সিনেমায় নিজের একটি স্বতন্ত্র অধ্যায় তৈরি করেছেন।

আর ক্যামেরার বাইরের নানা পাটেকর ছিলেন আরও একটি আলাদা গল্পের মানুষ—যিনি কৃষিকাজ পছন্দ করতেন, সাধারণ জীবনযাপন করতেন এবং কৃষক ও গ্রামীণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেন।

তাই নানা পাটেকরের উত্তরাধিকার শুধু তাঁর অভিনীত সিনেমায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। তাঁর সংগ্রাম, অভিনয়ের স্বাতন্ত্র্য, সরল জীবন এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতাও তাঁকে দীর্ঘদিন স্মরণীয় করে রাখবে।

আরও BUZZ

সেশ্যেলস আইল্যান্ডে নেচার ট্রেইল চ্যালেঞ্জের তৃতীয় আসর

সিটি অব গড সিনেমা: ব্রাজিলের ফাভেলা অপরাধ ও দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতা

পিরামিড: মরুর বুকে লেখা অমরত্বের গল্প

Lucifer: The God Who Chose to Walk

শূন্য থেকে বাংলাদেশের শিল্পপতি হওয়ার অসাধারণ গল্প