‘অবিনশ্বর দেবতাদের কাছ থেকে আগুন চুরি করে এনে নশ্বর মনুষ্যজাতিকে তা উপহার দেওয়ার অপরাধে, অনন্তকাল ধরে ভয়ংকর শাস্তি ভোগ করেছিলেন প্রমেথেউস’
গ্রীক উপকথার এই গল্পটি বলার মাধ্যমে শুরু হয় ক্রিস্টোফার নোলানের সদ্য মুক্তি প্রাপ্ত ছবি ‘ওপেহাইমার’। কাই বার্ড ও মার্টিন জে শেরউইন রচিত, পারমাণবিক বোমার জনক রবার্ট জে ওপেনহাইমারের জীবনকেন্দ্রিক একটি বই ‘আমেরিকান প্রমেথেউস’ অবলম্বনে তৈরি এই ছবিটি পরিচালকের স্বভাবসিদ্ধ নির্মাণভঙ্গী থেকে কিছুটা আলাদা।
কারণ, ক্রিস্টোফার নোলান নামটা শুনলেই সবার আগে যা মাথায় আসে তা হলো অনবদ্য এবং অকল্পনীয় কিছু দৃশ্যকল্প।
চিত্রনাট্য, চিত্রগ্রহণ, আবহসঙ্গীত, সম্পাদনা এই সমস্ত কিছু মিলিয়ে প্রায় প্রতিটি দৃশ্যই এমন নিঁখুত ভাবে নির্মিত হয় যে ছবিখানা শুধুমাত্র দেখার পরিধি ছাড়িয়ে অভিজ্ঞতার পরিধিতে প্রবেশ করে, ‘সিনেম্যাটিক এক্সপেরিয়েন্স’।
অথচ ‘ওপেনহাইমার’ ছবিটির প্রায় অনেকটা জুড়ে রয়েছে শুধুমাত্র কথোপকথন। নানা আকৃতির বিভিন্ন ঘরে, নানান বিচারবুদ্ধির কিছু মানুষের কথোপকথন। তবু কখনও, এক মুহূর্তের জন্যও মনে হয় না দৃশ্যকল্পের মহত্ব কোথাও হারিয়ে গিয়েছে। এক মুহূর্তের জন্যও নয়। যদিও সুযোগ ছিল পর্যাপ্ত।
এ ছবি এমনই এক ঐতিহাসিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৈরি যেখানে দর্শকের প্রত্যাশাই হল বিস্ফোরণ! ছবির পর্দায় গগনচুম্বী স্পেশাল এফেক্টের বিস্ফোরণ। যত বেশি, তত ভালো। তার ওপর নির্মাতার নাম যদি হয় ক্রিস্টোফার নোলান তা হলে প্রত্যাশার মাত্রা হয়ে যায় অপরিসীম। ক্রিস্টোফার নোলান ‘ওপেনহাইমার’ ছবিটি বানাচ্ছেন, এই কথাটি চাউর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আরও একটি কথা সামনে আসে যে এই ছবিতে পারমাণবিক বোমার প্রথম পরীক্ষার দৃশ্যায়নে সিজিআই ব্যবহার হবে না। সত্যিকারের বিস্ফোরণ হবে আর সেটারই ছবি তোলা হবে। কেমন হতে পারে সেই বিস্ফোরণ, কী ভাবে তোলা হয়েছে দৃশ্য, এই সব নিয়ে রীতিমতো চর্চা কৌতুহল শুরু হয়ে যায় সিনেমাভক্ত মহলে এবং সত্যি কথা বলতে কী ছবি দেখতে যাওয়ার আগে পর্যন্তও থাকে সেই কৌতূহল। তবে ছবিটি একবার দেখতে শুরু করার পর তা হয়ে ওঠে গৌণ। মূখ্য একমাত্র ছবির মূল বিষয়টা, দ্বন্দ্ব।
fission আর fusion, ছবির একদম গোড়াতেই দুটো আলাদা সময়কে এ ভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে দুটো আলাদা রঙের মাত্রা যোগ করে। গোটা ছবির বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে এই দ্বন্দ্ব উঠে এসেছে কাব্যিক দৃশ্য নির্মাণে। ইংরিজিতে যাকে বলে ভিজুয়াল পোয়েট্রি। একটা মানুষের ভেতরে চলা যাবতীয় অন্ধকার, ঝড়, সৃষ্টির আনন্দ, সৃষ্টির অনুশোচনা, তীব্রতা উঠে এসেছে সময় নিয়ে এক অপূর্ব খেলায় যা পরিচালক পারেন। সম্ভবত আমাদের সময়কালে সবচেয়ে ভালো পারেন। ‘ওপেনহাইমার’ ছবিটিও ব্যতিক্রম নয়। ছবিটির শুরু থেকেই বিভিন্ন সময়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়া হয় দর্শকদের আর সেই সব ক’টি সময়ের গল্প চলতে থাকে একটি নির্দিষ্ট দিকে। এই যাত্রা তখন শেষ হয় যখন এক শান্ত বিকেলে, এক শান্ত ঝিলের ধারে, নিজের যাবতীয় ভুল, দায়, মেনে নেওয়া আর স্বীকার করা উদযাপন করেন নায়ক।
ছবির চিত্রনাট্য ও সংলাপে সেই সময়কার আর্থ সামাজিক পরিস্থিতিটাও ঠিক ততটাই উঠে এসেছে যতটা এই ছবিটার জন্য দরকার। ওপেনহাইমার চরিত্রটার জন্য দরকার। তা সে কমিউনিজমই হোক, ডেমোক্র্যাট ও তাদের পরিচালিত রাষ্ট্র ব্যবস্থাই হোক অথবা খ্যাতির রাজনীতি। ওপেহাইমারের চরিত্রে Cillian Murphy ঠিক সেই ভুমিকাই পালন করে গেলেন যা জোকারের ক্ষেত্রে হিথ লেজার করেছিলেন। হয়ত আবারও ম্যানহাটান প্রোজেক্ট নিয়ে সিনেমা হবে, অন্য অনেক দক্ষ অভিনেতা অভিনয় করবেন ওপেনহাইমারের চরিত্রে, কিন্ত কিলিয়ান মাফিই হবেন তাদের মাপকাঠি। যে বিরাটত্বের কথা হচ্ছিল, ঠিক সেইটেই, ঠিক ততটাই। মাফি ছাড়া ছবির প্রধান তিন চরিত্রে রবার্ট ডাউনি জুনিয়র, ম্যাট ডেমন, এমিলি ব্লান্ট অনবদ্য। অপূর্ব। শিক্ষনীয়। এ ছাড়াও কিছু ছোট চরিত্রে কেসি অ্যাফ্লেক, ফ্লোরেন্স পাফ, রামি মালিক, জ্যাক কুইড ইত্যাদিরা মনে থেকে যাওয়ার মতো ভালো।
অভিনয় ছাড়াও এ ছবি দর্শকদের মুগ্ধ করবে আরও নানা কারণে। যেমন, Hoyte Van Hotyetema-র চিত্রগ্রহণ, Ludwig Goransson-এর সঙ্গীত আর Jennifer Lame-এর সম্পাদনা। যথাযথ বলতে যা বোঝায়, ঠিক তাই। যথাযথ। ছবির চিত্রনাট্য লিখেছেন পরিচালক নিজেই। সে লেখার পারদর্শীতা এখানেই যে ছবি দেখে বেরোনোর পর ‘কোয়ান্টাম মেকানিক্স’ জাতীয় শব্দ আপনার অচেনা তো লাগবেই না বরং মনে হবে এই নিয়ে কথা বলা যায়। কথা হোক। না জানলে জেনে নেব আরও।
এ ছবির সার্থকতা এখানেই। এই সততার উদযাপনে। যেখানে ছবির মূল চরিত্রকে বলা যায়, তুমি ভুল করলে তার ফল ভোগ করবেই। তাই সমবেদনা আশা না করে এগিয়ে যাও। আর ছবির নায়ক, সে কথা বুঝতে পারলেন, মেনে নিলেন, যে একবার ধ্বংসের নির্মাণ একবার শুরু হয়ে গেলে কোনও প্রযুক্তি দিয়েই তাকে আটকানো সম্ভব হবে না। কারণ, মানুষ নশ্বর আর তিনি প্রমেথেউসের মতো অবিনশ্বর আগুন এনে দিয়েছেন তাদের হাতে, যে আগুনের আলোর তীব্রতায় লেখা আছে ‘ডেথ অ্যান্ড ডেসট্রাকশন’, বুঝতে পারলেন৷ মেনেও নিলেন। পারমাণবিক বোমার জনক, রবার্ট.জে.ওপেনহাইমার। এক শান্ত বিকেলে, এক শান্ত ঝিলের ধারে।
