এটি শুধু ইচ্ছাশক্তির অভাব নয়। এর পেছনে রয়েছে মানুষের মস্তিষ্কের পুরস্কার পাওয়ার প্রবণতা, নতুন কিছু জানার কৌতূহল, একঘেয়েমি এড়ানোর চেষ্টা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিশেষ কিছু নকশা।
১. ডোপামিন: নতুন কিছু দেখার প্রত্যাশা
ফোন স্ক্রল করার অভ্যাস বোঝার ক্ষেত্রে ডোপামিনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ডোপামিন মস্তিষ্কের একটি রাসায়নিক বার্তাবাহক, যা প্রেরণা, শেখা এবং পুরস্কার-সম্পর্কিত প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়।
ধরুন, আপনি একটি ভিডিও দেখছেন। পরের ভিডিওটি মজার হবে, অবাক করবে, নাকি একেবারেই সাধারণ হবে—আপনি জানেন না। এই অনিশ্চয়তা আপনাকে আরও একটি ভিডিও দেখতে উৎসাহিত করতে পারে।
এখানে মূল বিষয়টি শুধু আনন্দ পাওয়া নয়; বরং আনন্দ পাওয়ার সম্ভাবনা এবং তার প্রত্যাশা।
মনোবিজ্ঞানে পুরস্কারের অনিশ্চয়তা ও পরিবর্তনশীল পুরস্কারের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। সোশ্যাল মিডিয়ায় কখন মজার ভিডিও, আকর্ষণীয় খবর বা নতুন মন্তব্য পাবেন, তা আগে থেকে বোঝা যায় না। ফলে আরও একবার স্ক্রল করার তাগিদ তৈরি হতে পারে।
তবে ডোপামিনকে শুধু ‘আনন্দের রাসায়নিক’ বলা ঠিক নয়। এটি আমাদের কোনো কিছুর প্রতি মনোযোগ দেওয়া, সেটি খোঁজা এবং সেই আচরণ থেকে শেখার প্রক্রিয়ার সঙ্গেও জড়িত।
২. Variable Reward: পরের স্ক্রলে কী পাবেন, তা অজানা
মনে করুন, একটি বাক্স খুললে প্রতিবার একই জিনিস পাওয়া যায় না। কখনো আকর্ষণীয় কিছু, কখনো সাধারণ কিছু, আবার কখনো বিশেষ কিছু পাওয়া যায়। এই অনিশ্চয়তা বারবার বাক্সটি খুলতে উৎসাহিত করতে পারে।
সোশ্যাল মিডিয়ার ফিডেও অনেকটা এমন অভিজ্ঞতা হয়:
-
কখনো অসাধারণ মজার একটি ভিডিও পাওয়া যায়।
-
কখনো পরিচিত কারও নতুন পোস্ট চোখে পড়ে।
-
কখনো নিজের আগ্রহের কোনো তথ্য পাওয়া যায়।
-
আবার কখনো কিছুই বিশেষ ভালো লাগে না।
তবুও আপনি পরের পোস্টটি দেখতে চান। কারণ, পরেরটিতে আরও আকর্ষণীয় কিছু থাকতে পারে।
এটিকে মনোবিজ্ঞানের variable reward বা পরিবর্তনশীল পুরস্কারের ধারণার সঙ্গে ব্যাখ্যা করা যায়। তবে সব ধরনের স্ক্রলিং একইভাবে কাজ করে না, এবং প্রত্যেক ব্যবহারকারীর প্রতিক্রিয়াও এক নয়।
৩. একঘেয়েমি ও মানসিক অস্বস্তি থেকে পালানোর চেষ্টা
আপনি যখন বিরক্ত, একা, চিন্তিত কিংবা কোনো কাজে মন বসাতে পারছেন না, তখন ফোন হাতে নেওয়া সহজ একটি বিকল্প হয়ে ওঠে।
কেন?
কারণ, স্ক্রল করার জন্য খুব বেশি মানসিক পরিশ্রমের প্রয়োজন হয় না। অন্যদিকে পড়াশোনা, কাজ বা কোনো জটিল সমস্যা সমাধানের জন্য মনোযোগ ও ধৈর্য দরকার।
ফলে মস্তিষ্ক তাৎক্ষণিকভাবে সহজ ও আকর্ষণীয় কোনো কাজের দিকে ঝুঁকতে পারে।
এখানে একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া কাজ করে—emotion regulation, অর্থাৎ আবেগ নিয়ন্ত্রণ। কেউ কেউ একঘেয়েমি, দুশ্চিন্তা বা অস্বস্তিকর অনুভূতি সাময়িকভাবে কমানোর জন্য ফোন ব্যবহার করেন। গবেষণায় আবেগ নিয়ন্ত্রণে অসুবিধা এবং সমস্যাজনক স্মার্টফোন ব্যবহারের মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
কিন্তু সমস্যা হলো, সাময়িক স্বস্তি পাওয়ার এই অভ্যাস বারবার পুনরাবৃত্তি হতে পারে।
ধীরে ধীরে এমন একটি চক্র তৈরি হয়:
একঘেয়েমি বা অস্বস্তি- কিছু ভালো লাগছে না, মন বসছে না- ফোন হাতে নেওয়া- সহজ বিনোদন ও নতুন কনটেন্টের সন্ধান- সাময়িক স্বস্তি- একঘেয়েমি বা অস্বস্তি থেকে মন সরে যায়- অভ্যাস আরও শক্তিশালী হয়- পরেরবার অস্বস্তি হলেই ফোনের কথা মনে পড়ে
৪. FOMO: কিছু মিস হয়ে যাচ্ছে—এই ভয়
FOMO-এর পূর্ণরূপ Fear of Missing Out। অর্থাৎ, অন্য কোথাও আকর্ষণীয় কিছু ঘটছে, অথচ আপনি তা জানতে পারছেন না—এমন একটি আশঙ্কা।
বন্ধুদের নতুন পোস্ট, আলোচিত ঘটনা, ভাইরাল ভিডিও কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো আপডেট মিস হয়ে যাওয়ার চিন্তা আপনাকে বারবার ফোন পরীক্ষা করতে উৎসাহিত করতে পারে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্যদের জীবনের নির্বাচিত সুন্দর মুহূর্তগুলো দেখতে দেখতে মনে হতে পারে, সব সময় অনলাইনে না থাকলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু থেকে পিছিয়ে পড়বেন।
কিন্তু বাস্তবে সব পোস্ট দেখা বা প্রতিটি আপডেট জানা সম্ভব নয়। তবুও নতুন কিছু আসার সম্ভাবনা ফোন পরীক্ষা করার অভ্যাসকে টিকিয়ে রাখতে পারে।
৫. Habit Loop: কখন ফোন হাতে নিচ্ছেন, সেটি কি খেয়াল করেন?
শুরুর দিকে হয়তো আপনি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে ফোন ব্যবহার করতেন। কিন্তু বারবার একই পরিস্থিতিতে ফোন ব্যবহার করতে করতে আচরণটি অভ্যাসে পরিণত হতে পারে।
মনোবিজ্ঞানে অভ্যাসের একটি পরিচিত মডেল হলো Habit Loop। এর তিনটি অংশ রয়েছে:
-
Cue (সংকেত): কোনো কাজ কঠিন লাগছে, নোটিফিকেশন এসেছে, কিংবা আপনি বিছানায় শুয়েছেন।
-
Routine (অভ্যাস): স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফোন খুলে স্ক্রল করা শুরু করলেন।
-
Reward (পুরস্কার): নতুন কিছু দেখলেন, সাময়িক স্বস্তি পেলেন অথবা একঘেয়েমি কাটল।
একসময় ফোন ব্যবহারের সিদ্ধান্তটি আর পুরোপুরি সচেতনভাবে নেওয়া হয় না। কোনো কাজের মাঝখানে সামান্য বিরতি পেলেই হাত ফোনের দিকে চলে যায়।
এ কারণেই শুধু নিজের ইচ্ছাশক্তির ওপর নির্ভর করে অভ্যাস বদলানো কঠিন হতে পারে। পরিবেশ ও দৈনন্দিন রুটিনে পরিবর্তন আনাও গুরুত্বপূর্ণ
৬. Infinite Scroll: থামার স্বাভাবিক সংকেতটি কোথায়?
একটি বইয়ের অধ্যায় শেষ হলে, একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান শেষ হলে কিংবা সংবাদপত্রের পাতা শেষ হলে স্বাভাবিকভাবেই বিরতি নেওয়ার সুযোগ আসে।
কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার infinite scroll বা অবিরাম স্ক্রলিং ব্যবস্থায় নতুন কনটেন্ট পেতে বারবার আলাদা কোনো কাজ করতে হয় না। শুধু আঙুল চালালেই হয়।
এর ফলে ব্যবহারকারী সহজেই একটি পোস্ট থেকে অন্য পোস্টে চলে যেতে পারেন, অথচ কখন থামবেন তার কোনো স্পষ্ট সংকেত পান না।
অ্যালগরিদমও আপনার আগ্রহের সঙ্গে মেলে এমন কনটেন্ট দেখানোর চেষ্টা করে। ফলে স্ক্রলিং চালিয়ে যাওয়া আরও সহজ হয়।
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের প্রকাশিত গবেষণার সারাংশে দেখা গেছে, ভিডিও দেখতে দেখতে বারবার অন্য ভিডিওতে চলে যাওয়া একঘেয়েমি কমানোর বদলে কখনো কখনো একঘেয়েমি বাড়াতে পারে। অর্থাৎ, বেশি কনটেন্ট দেখা মানেই বেশি তৃপ্তি পাওয়া নয়।
কীভাবে এই অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসবেন?
লক্ষ্য ফোন পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া নয়; বরং কখন এবং কেন ফোন ব্যবহার করছেন, সেই নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া।
১. অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করুন
জরুরি নয় এমন অ্যাপের নোটিফিকেশন বন্ধ রাখলে বারবার ফোন পরীক্ষা করার বাহ্যিক সংকেত কমে যায়।
২. ফোন ব্যবহারের নির্দিষ্ট সময় ঠিক করুন
উদ্দেশ্য ছাড়া প্রতিবার ফোন খোলার বদলে নির্দিষ্ট সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
৩. ফোন ধরার আগে নিজেকে একটি প্রশ্ন করুন
“আমি কি কোনো নির্দিষ্ট কাজের জন্য ফোন ধরছি, নাকি শুধু বিরক্ত লাগছে বলে?”
এই ছোট বিরতিটি স্বয়ংক্রিয় আচরণকে সচেতন সিদ্ধান্তে রূপ দিতে সাহায্য করতে পারে।
৪. বিকল্প কাজের ব্যবস্থা রাখুন
বই পড়া, হাঁটা, ছবি আঁকা, গান শোনা বা কারও সঙ্গে কথা বলার মতো বিকল্প রাখুন। একঘেয়েমি এলেই ফোন ব্যবহার করতে হবে—এমন নয়।
৫. ঘুমের আগে ফোন থেকে বিরতি নিন
ঘুমানোর আগে ফোন দূরে রাখুন এবং সম্ভব হলে বিছানায় ফোন ব্যবহার না করার অভ্যাস করুন। এতে রাতের স্ক্রলিং কমাতে সুবিধা হতে পারে।
কখন বুঝবেন ফোন ব্যবহারের অভ্যাসটি সমস্যা হয়ে উঠছে?
শুধু অনেকক্ষণ ফোন ব্যবহার করলেই কাউকে আসক্ত বলা যায় না। ফোন ব্যবহারের উদ্দেশ্য, নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এবং দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাবও বিবেচনা করতে হয়।
নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করুন:
-
প্রয়োজনীয় কাজের সময়ও কি বারবার ফোন খুলে ফেলেন?
-
কম ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েও কি বারবার তা ধরে রাখতে পারেন না?
-
ফোন ব্যবহারের কারণে কি ঘুম, পড়াশোনা বা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো ব্যাহত হচ্ছে?
-
ফোন ব্যবহার করতে না পারলে কি অস্বাভাবিক অস্থিরতা অনুভব করেন?
একাধিক প্রশ্নের উত্তর যদি নিয়মিতভাবে ‘হ্যাঁ’ হয়, তাহলে অভ্যাসটি পরিবর্তনের দিকে মনোযোগ দেওয়া ভালো। সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করলে বিশ্বস্ত অভিভাবক বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সঙ্গে কথা বলতে পারেন।
শেষ কথা
সারাক্ষণ ফোন স্ক্রল করার অভ্যাসের পেছনে শুধু প্রযুক্তি নয়, মানুষের স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতাও কাজ করে। নতুন কিছু জানার কৌতূহল, তাৎক্ষণিক পুরস্কারের প্রত্যাশা, একঘেয়েমি থেকে মুক্তি এবং বারবার পুনরাবৃত্ত আচরণ—সবকিছু মিলেই এই অভ্যাস তৈরি হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আপনি ফোন ব্যবহার করছেন নিজের প্রয়োজনে, নাকি অভ্যাসের বশে ফোন আপনাকে ব্যবহার করাচ্ছে?
এই পার্থক্যটি বুঝতে পারাই সচেতন ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তোলার প্রথম ধাপ।
তথ্যসূত্র:
American Psychological Association —
অনলাইন ভিডিও বারবার বদলে দেখলে একঘেয়েমি বাড়তে পারে;
সমস্যাজনক স্মার্টফোন ব্যবহারের মনোবৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা;
আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও স্মার্টফোন ব্যবহারের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা।